Breaking News

স্বরূপকাঠির ভাসমান পেয়ারার বাজার!





  • বাংলাদেশ নিয়ে অনেকের আক্ষেপের শেষ নেই, বিদেশে কত চমৎকার সব জায়গা আছে, আমাদেরই কিছু নেই। যারা থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেট দেখে ভাবেন, আহা! নদীমাতৃক বাংলাদেশে কেন এরকম একটি বাজার নেই, তারা অনেকেই হয়ত জানেন না বর্ষায় বাংলাদেশেও এমন একটি মার্কেট বসে।পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা ও ভীমরুলির  এই ভাসমান বাজারটি রূপে গুনে পুরোপুরিই প্রাকৃতিক। পেয়ারার জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চল। কয়েক মাইল এলাকা জুড়ে এখানে পেয়ারা চাষ হয়, জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় বলে দুপাশের মাটি তুলে মোটা আইল বানানো হয় যেখানে পেয়ারা গাছ লাগানো হয়েছে । যার ফলে পেয়ারা গাছের সাড়ির দুপাশে তৈরি হয়েছে নালার মত যেটাতে ডিঙ্গি নৌকা চলে। বর্ষা হচ্ছে পেয়ারার মৌসুম। নৌকা করে গিয়ে পাকা পেয়ারা সংগ্রহ করা হয় ।
    আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নেই হয় পেয়ারার আসল কেনাবেচা। বাগান মালিকেরা নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসেন । ভীমরুলি, আটঘর আর কুড়িয়ানা – তিনটি জায়গায় বসে ভাসমান পেয়ারার বাজার। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বড় বড় ইঞ্জিন বোট নিয়ে সেখানে হাজির হয়ে পেয়ারা কিনেন। পেয়ারা কেনা হয় নৌকা হিসেবে কিংবা মন হিসেবে। এই হাটগুলো ভ্রমণের সবচেয়ে ভাল সময় হচ্ছে পেয়ারার ভরা মৌসুম জুলাই থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত । পেয়ারার পাশাপাশি এই এলাকা আমড়ার জন্যও দেশ বিখ্যাত।
    বাংলাদেশের এই প্রাকৃতিক খালের উপরে সম্পূর্ণ কৃত্রিমতা বর্জিত ভাসমান বাজারটি তাই অনেকের কাছেই আকর্ষণীয় গন্তব্য! বিশেষ করে যে সব বিদেশীরা বাংলাদেশে আসেন, তারা চেষ্টা করেন এখানে একবার একটি ঢু মেরে যেতে।
    কোথায়: পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর, ভীমরুলি ও কুড়িয়ানা বাজার। ভীমরুলি-ই তুলনামূলক বড় বাজার।
    কিভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে যাবার উপায় দুটা। একটি নদী পথে অন্যটি সড়ক পথে। সদরঘাট থেকে হুলার-হাট গামী লঞ্চ এ উঠে যেতে পারেন। প্রতিদিন রাত ৬ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত ৩/৪ টি লঞ্চ ছেড়ে যায় হুলার-হাট এর উদ্দেশ্যে। পছন্দমত যে কোন একটায় চড়ে বসুন। ভাড়া নেবে ডেকে ২০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৯০০ টাকা, ডাবল কেবিন ১৮০০ টাকা। পরদিন সকাল ৫/৬ টায় পৌঁছে যাবেন ইন্দুর-হাট ঘাটে (নেছারাবাদ)। এখানেই নেমে পড়ুন। নেমেই নাস্তা করে একটা ট্রলার ঠিক করে ফেলুন। ভাড়া ঠিক করবেন ১৫০০ টাকা। ৬/৭ ঘণ্টা ঘুরবেন এটা বলে নেবেন। প্রথমে আটঘর বাজার, তারপর কুড়িয়ানা বাজার ঘুরে, ভীমরুলি বাজার চলে যান। (আটঘর স্কুলের পাশ দিয়ে একটা সরু খাল আসে ভীমরুলি যাওয়া যায়)। ফিরতি পথে ভীমরুলি হয়ে স্বরূপকাঠি ফেরত চলে আসুন, ওখানে বাস স্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠে গুঠিয়া নেমে যান ৩০ টাকা ভাড়া। এরপর অটোতে দুর্গা-সাগর দিঘী ১০ টাকা ভাড়া। এরপর বরিশাল বাসে করে ২০ টাকা ভাড়া। বরিশাল থেকে লঞ্চ ছাড়া শুরু হয় ৮.৩০ এ। শেষ লঞ্চ ছাড়ে ৯ টায়।
    সড়ক পথে যেতে হলে, ঢাকা থেকে আগে বরিশাল যেতে হবে। বরিশালের রূপাতলী বাস স্ট্যান্ড থেকে খুলনা-গামী ধানসিঁড়ি পরিবহনে উঠবেন। ঝালকাঠি পার হয়ে কির্তীপাশা মোড় এ নামিয়ে দিতে বলবেন। ভাড়া নেবে ৬০ টাকা। সেখান থেকে অটোতে ভিমরুলি যেতে পারবেন ২০-৩০ টাকা (জনপ্রতি) দিয়ে। রিজার্ভ করলে খরচ বাড়বে।

    খালে খালে ঘুরে গাছ থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে চাষিরা। ছবি: সিয়াম আনোয়ার। 
    কী করবেন: স্বরূপকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাজার ব্যস্ত এলাকা। সবাই যার যার মত করে হৈ চৈ করে কেনা বেচা করছে। আপনি তাদের কর্ম-কোলাহলময় ব্যস্ততা দেখতে দেখতে ছোট্ট একটা নৌকো ভাড়া করে পেয়ারা বাগানগুলো ঘুরে দেখতে পারেন। জোয়ারের পানি থেকে পেয়ারা বাগান বাঁচাতে মাটি তুলে উঁচু উঁচু আইল তৈরি করা হয়েছে, আর তাতে তৈরি হয়েছে সরু সরু খাল। সেই খাল বেয়ে ছোট নৌকায় করে পেয়ারা সংগ্রহ করে চাষিরা। দুপুরে খেতে চাইলে যেতে পারেন কুড়িয়ানা বাজারে। সকাল সন্ধ্যা হোটেল নামে একটি স্থানীয় হোটেল আছে এখানে, স্থানীয় ভাবে বৌদির হোটেল নামে পরিচিত। এখানকার রান্নার প্রশংসা সবাই করে। ফিরতি পথে যেতে পারেন গুঠিয়া মসজিদ আর দুর্গা-সাগর দিঘী। ফেরার পথে মনে চাইলে টাটকা পেয়ারা কিনে নিয়ে যেতে পারেন।
    এক দিনে গিয়ে পরের দিন ঢাকায় নেমে অফিস করতে পারা যায় এরকম একটি গন্তব্য এটি। ব্যস্ততা থেকে এক দিনের ছুটি নিতে জুড়ি নেই জায়গাটির!