Breaking News

বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন’ ছাড়া সব নির্বাচন হয়







  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষকদের নির্বাচন হয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনও হয়। কিন্তু যে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, তাদের নির্বাচনটিই অনুষ্ঠিত হয় না।

    সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থিতিশীল পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতা, সামাজিক-সাংস্কতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিকল্প নেই। যখন যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ক্ষমতাসীন দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার ভয়ে এ নির্বাচনের আয়োজন করা হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষের সাহসী ও দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য সব নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ২২ মে সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ দিন ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়া সিনেটের শিক্ষক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করায় প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের রোষানলে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় হট্টগোলের সৃষ্টি হয়েছে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। তবে প্রতিবাদরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা করেছেন শিক্ষকরা।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সিনেটের ১০৪ সদস্যের মধ্যে ৫ জন থাকবে ছাত্র প্রতিনিধি। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্র প্রতিনিধি নেই। এরই প্রতিবাদ জানাতে যায় শিক্ষার্থীরা।

    দেশের দ্বিতীয় সংসদ হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ২৬ বছর ধরে অকার্যকর হয়ে আছে। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১’র স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে ৯০’র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ গণতান্ত্রিক, জাতীয় মুক্তি ও স্বাধিকার আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থী। আর যুগ যুগ ধরে সেই অকুতোভয় সৈনিকদের নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। কালের আবর্তে আজ তার ঐতিহ্য হারিয়েছে।

    তবে চলতি বছরের ৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তনে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের তাগাদার পর দুই যুগের বেশি সময় ধরে অকার্যকর হয়ে থাকা ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সেসময় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, ‘ডাকসু ইলেকশন ইজ মাস্ট। তা না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বশূন্য হয়ে যাবে।’

    এরপর বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে এ নির্বাচনের ব্যাপারে জারালো দাবি উঠতে শুরু করেছে। তারা হাতে নিয়েছে নানা কর্মসূচি।

    গত ১৮ মে ডাকসুসহ সকল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাবেশ করেছে ‘ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সমাজ’। সমাবেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গড়া ওঠা এ সংগঠনটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ‘ডাকসু মঞ্চ’ গঠন করেছে।

    এর আগে চলতি বছরের ১৯ মার্চ ‘ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সমাজের’ আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জাফরুল নাদিমসহ ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মো. মনসুর আহমদ ও সাবেক জিএস মুশতাক হোসেন ডাকসু নির্বাচন চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন।

    এ বিষয়ে জাফরুল নাদিম প্রিয়.কমকে বলেন, ডাকসুসহ সব ছাত্র সংসদ নির্বাচন দাবিতে এই মঞ্চ গঠন করা হয়েছে। দলমত-নির্বিশেষে এক দফা দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু হচ্ছে। রমজানের আগে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে উন্মুক্ত সভা করা হবে।

    নাদিম আরও বলেন, ছাত্রসমাজকে ধ্বংস করতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। সব ষড়যন্ত্র দূরে ঠেলে আমরা ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে চাই। সব বিশ্ববিদ্যালয়েই এমন মঞ্চ গঠন করা হোক। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষক সমিতিসহ অন্য কোনো নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না। সবাইকে নিজেদের অধিকার আদায়ে এগিয়ে আসতে হবে।

    ২২ মে ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়া সিনেটের শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রতিবাদ জানালে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের রোষানলে পড়েন। ছবি: সংগৃহীত

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক সরকারের শাসনামলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের সরকারের সময়ে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৯০ সালে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরুর পর থেকেই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং মাঝে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কেউই ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করেনি।

    ছাত্ররা আন্দোলন করে দেশে গণতন্ত্র এনেছেন, কিন্তু তাদের গণতন্ত্র চর্চার সবচেয়ে বড় প্লাটফর্মটিই হারিয়ে বসেছেন। গণতান্ত্রিকভাবে সর্বজনীন নেতা নির্বাচনের সুযোগ হারিয়েছেন। বর্তমানে ছাত্ররা ডাকসু ও হল সংসদ বাবদ ফি পরিশোধ করছেন কিন্তু তাতে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

    অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী, সিনেটের ১০৪ সদস্যের মধ্যে ৫ জন থাকবে ছাত্র প্রতিনিধি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামে ছাত্র স্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করতেন এই ছাত্র প্রতিনিধিরাই। ডাকসু নির্বাচন নেই বলে এই নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিও নেই।

    ফলে ছাত্রদের অনেক দাবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অজানাই থেকে যাচ্ছে, আবার অনেক দাবি বাস্তবায়নে গুরুত্ব বা অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। তবে সিনেটে নির্বাচিত শিক্ষক, রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়।

    ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছি কবে ডাকসু নির্বাচন হবে। শুধু ডাকসু নয়, দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রায় আলোচনা করে থাকি।’

    ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি তুহিন কান্তি দাস বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রের প্রাণের দাবি ডাকসু নির্বাচন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডাকসু নির্বাচন দেয়া উপযোগী সময়।’

    তিনি বলেন, ‘কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা নেই। সব ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এরই ফলে ছাত্ররাই নেতৃত্বে আসছেন। অথচ ৯০’র আগে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। তারপরও ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ৯০’র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ডাকসু সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয় তখন। কিন্তু তারপর গণতান্ত্রিক সরকারগুলোই ডাকসু নির্বাচন অবরুদ্ধ করে রাখে।’

    ‘ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব সিদ্ধান্ত হচ্ছে তাতে ছাত্রদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই এবং ছাত্ররা সেটা অনুধাবন করতে পারে না যে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের একটি ভূমিকা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিসহ সব ধরনের নির্বাচন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে অথচ শিক্ষার্থীদের নির্বাচনটা হচ্ছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান আগের জায়গায় নেই,’ অভিযোগ করেন তুহিন কান্তি দাস।

    প্রিয়.কমকে তিনি আরও বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের দৌরাত্ম্য প্রভৃতির ফলে ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিঘ্ন ঘটছে। ২৬ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন অবরুদ্ধ।’

    তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা অবৈধ। কারণ সিনেট ও সিন্ডিকেটে ছাত্র প্রতিনিধি তো নেই, অন্যান্য প্রতিনিধিও অনেক ক্ষেত্রে থাকে না। কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

    ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার সুনিশ্চিত হোক, সেটা আমরা চাই। যেহেতু রাষ্ট্রপতি এ নির্বাচন হোক সেটা চাচ্ছে, তাহলে এ নির্বাচন হওয়ার আর কোনো বাধা রইল না। এখন দরকার প্রশাসনের সেটা কার্যকর করা।’

    ‘প্রশাসন চাইলে সবকিছু করতে পারে। আমাদের পক্ষ থেকে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দরকার ছাত্রদলসহ সব প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের ক্যাম্পাসে সহাবস্থান সুনিশ্চিত করা। ক্যাম্পাসে সব প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনকে সহাবস্থান সুনিশ্চিত করা মানে ডাকসু নির্বাচনের প্রথম ধাপ এগোনো। তবে এ নির্বাচন মুখে মুখে চাইলে হবে না, বাস্তবে কার্যকর করতে চাইলে এ ব্যাপারে প্রশাসনকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রশাসন যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মনে করব আসলেই তারা ডাকসু নির্বাচন চায়,’ বলেন আবুল বাশার।

    ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজীর বলেন, ‘আমরা তো এতদিন জানতাম, ভিসি, প্রশাসন এবং ছাত্র ও সংগঠনগুলো ডাকসু নির্বাচন চায়। এখন জানলাম, রাষ্ট্রপতিও এ নির্বাচন চান। তাহলে আমার প্রশ্ন, এ নির্বাচন কে আটকায়?’

    ‘আমার কাছে মনে হয়, প্রশাসনের কাছে এ নির্বাচন দেওয়ার নিষ্ঠার অভাব রয়েছে। তারা উপরে বলে ডাকসু নির্বাচন দরকার, কিন্তু ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট হবে এ রকম অজুহাত দেখিয়ে তারা এ নির্বাচন দিচ্ছে না। আমাদের কথা হচ্ছে, ক্যাম্পাসের সার্বিক গণতান্ত্রিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার একটি উপায়। ফলে এটা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং ছাত্র সংগঠন সহযোগিতা করবে। নির্বাচনের জন্য ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। প্রশাসন যদি সদিচ্ছা প্রকাশ করে, তাহলে এ নির্বাচন হওয়া সম্ভব। কারও সাধ্য নেই আটকানোর,’ বলেন উম্মে হাবিবা।

    এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিস সিদ্দিক প্রিয়.কমকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে আমরা ভাবছি, এখন হাইকোর্টের রুলের জবাব তৈরি করছি।’

    ফিরে দেখা ডাকসু

    ১৯২১ সালে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সৃষ্টি হয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এক টাকা চাঁদা দিয়ে এর সদস্য হতে হতো। এভাবেই যাত্রা শুরু হয় দেশের স্বাধিকার, ভাষার সংগ্রাম ও স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার ডাকসুর।

    মোট ৩৬বার এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডাকসুর প্রথম ভিপি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। ১৯২৮-২৯ সেশনে ভিপি ও জিএস হিসেবে নির্বাচিত হন এ এম আজহারুল ইসলাম ও এস চক্রবর্তী, ১৯২৯-৩২ সময়কালে রমণী কান্ত ভট্টাচার্য ও কাজী রহমত আলী ও আতাউর রহমান, ১৯৪৭-৪৮ সেশনে অরবিন্দ বোস ও গোলাম আযম, ১৯৫৩-৫৪ সালে এস এ বারী এটি ও জুলমত আলী খান, ফরিদ আহমেদ। এরপর বিভিন্ন সময় ভিপি ও জিএস নির্বাচিতদের মধ্যে যথাক্রমে রয়েছেন নিরোদ বিহারী নাগ ও আব্দুর রব চৌধুরী, একরামুল হক ও শাহ আলী হোসেন, বদরুল আলম ও মো. ফজলী হোসেন, আবুল হোসেন ও এটিএম মেহেদী, আমিনুল ইসলাম তুলা ও আশরাফ উদ্দিন মকবুল, বেগম জাহানারা আখতার ও অমূল্য কুমার, এস এম রফিকুল হক ও এনায়েতুর রহমান, শ্যামা প্রসাদ ঘোষ ও কে এম ওবায়েদুর রহমান, রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরী, বোরহান উদ্দিন ও আসাফুদ্দৌলা, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী ও শফি আহমেদ, মাহফুজা খানম ও মোরশেদ আলী, তোফায়েল আহমেদ ও নাজিম কামরান চৌধুরী, আসম আব্দুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন।

    নির্বাচনের উদ্যোগ হয়, অনুষ্ঠিত হয় না

    ১৯৯০ সালের ৬ জুনের নির্বাচনের এক বছর পর ১৯৯১ সালের ১২ জুন তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তখন ছাত্রনেতারা ছাত্রত্ব ঠিক করতে এবং প্রার্থী হওয়ার জন্য বিশেষ ভর্তির দাবি করে। এ নিয়ে সৃষ্ট সহিংসতায় তখন নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে যায়। ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদও ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করেন। কিন্তু পরিবেশ না থাকার অভিযোগ এনে সেসময়ে বিরোধী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের বাধার মুখে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। একইভাবে ১৯৯৫ সালেও ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করা হয়। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৯৬ সালে অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের সময়সীমার কথা জানান। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় ব্যর্থ হন।

    ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু হলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ছাত্রদল নেতা আরিফ হোসেন তাজ খুন হন। ঐ ঘটনা তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটি ১৯৯৮ সালের ২৩ মে রিপোর্ট দেয়। রিপোর্টে তখনকার মেয়াদোত্তীর্ণ ডাকসু ভেঙে দেওয়া এবং পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করে। সে অনুযায়ী ২৭ মে সিন্ডিকেট সভায় ডাকসু ভেঙে দেওয়া হয়। এরপরও অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী দুবার নির্বাচনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের অসহযোগিতার কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়নি বলে উপাচার্যের অভিযোগ রয়েছে। সেসময় ডাকসুর জন্য গঠিত নতুন (সংশোধিত) গঠনতন্ত্রে ডাকসু ভাঙার চার মাসের মধ্যে পুনরায় নির্বাচনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত ডাকসুর তফসিল ঘোষণা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ এবং হল সংসদ নির্বাচনের স্বপ্ন ছাত্রদের অধরাই থেকে গেছে।

    ২০০৫ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ ওই বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। উপাচার্যের ওই ঘোষণার পর ছাত্র সংগঠনগুলো নড়েচড়ে বসে। ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে একাধিকবার মিছিল সমাবেশ এবং ভিসির কাছে স্মারকলিপিও দেয়। তবে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো এগিয়ে আসেনি।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পরও ডাকসু নির্বাচনের জোর দাবি ওঠে। এ নিয়ে আদালত পর্যন্ত দাবি গড়ায়। শিক্ষার্থীরা পৃথক মঞ্চ করে আন্দোলনও গড়ে তোলে। বিভিন্ন সময় উপাচার্য তার বক্তব্যেও উল্লেখ করেছেন, নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার অভাব নেই। কিন্তু নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।

    ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি গঠন হওয়ার পর ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটিও উপাচার্যের কাছে ডাকসু নির্বাচনসহ ১৯ দফা দাবি জানিয়েছে। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন চেয়ে এ বছরের ১৯ মার্চ ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মো. মনসুর আহমদ ও সাবেক জিএস মুশতাক হোসেনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র হাইকোর্টে রিট আবেদন করে।

    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)

    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবে ১৯৫৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃস্থানীয় ছাত্ররা তৎকালীন উপাচার্য ড. ইতরাত হোসেন জুবেরীর কাছে ছাত্রসংসদের দাবি তুলে ধরেন। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন উপাচার্য ১৫ সদস্য বিশিষ্ট ছাত্র-সংসদের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেন এবং ওই বছরই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

    নির্বাচনে ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন যথাক্রমে মনিরুজ্জামান মিয়া ও আব্দুর রাজ্জাক খান। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শক্তিবলে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে সব গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেন। ফলে ১৯৫৮-৬২ সাল পর্যন্ত রাকসুর সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও দাবির মুখে ১৯৬৩ সালের প্রথম দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ রাকসু পুনরায় গঠন করেন।

    সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন যথাক্রমে রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ও রুহুল কুদ্দুস বাবু।

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে। চাকসুর প্রথম ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন যথাক্রমে মোহাম্মদ ইব্রাহিম এবং আবদুর রব। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অকার্যকর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু)। আর সর্বশেষ ১৯৯০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভিপি ও জিএস হন যথাক্রমে নাজিম উদ্দীন এবং আজিম উদ্দীন।

    কিন্তু এর কিছুদিন পরেই শিবিরের হাতে ছাত্রঐক্য’র নেতা ফারুকুজ্জামান খুন হওয়ার পর চাকসুর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এ দিকে চাকসু সচল না থাকায় আবাসিক হলগুলোর সংসদও অকার্যকর হয়ে আছে। নির্বাচনের দাবিতে উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছে ছাত্রলীগ। এ ছাড়া নির্বাচনের দাবিতে একাধিক সংবাদ সম্মেল করছে শাখা ছাত্রলীগ।

    জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)

    জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) গঠিত হয় ১৯৭২ সালে। ১৯৭৯ সালে সর্বশেষ জাকসু সংবিধান সংশোধিত হয়। জাকসুর সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী, বৈধ সব আবাসিক ছাত্র এর সদস্য হতে পারবেন এবং প্রতি বছর নির্বাচনের মাধ্যমে এর প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। এর প্রেসিডেন্ট থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। জাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে ১৯৯৩ সালে। জাকসুর প্রথম ভিপি ও জিএস ছিলেন যথাক্রমে গোলাম মোশরাউদ ও রোকন উদ্দিন। আর সর্বশেষ নির্বাচিত ভিপি ও জিএস হলেন যথাক্রমে মাসুদ হাসান তালুকদার ও শামসুল তাবরীজী।