(প্রিয়.কম) হঠাৎ করে একসেঞ্চার বাংলাদেশের সকল কর্মীকে ছাঁটাই করে কোম্পানী বন্ধ হওয়ার ঘোষণা যেন বর্তমান সময়ে দেশীয় প্রযুক্তি খাতের আলোচনার অন্যতম অংশ হয়ে উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রিয়.কমে এই সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই নানাভাবেই এই খাতের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একসেঞ্চার। আর বরাবরের মতোই এবারও বাদ যায়নি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই নিয়ে আলোচনা সমালোচনা। অনেকেই এ ঘটনাকে বাংলাদেশের আইটি খাতের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হিসেবে ‍উল্লেখ করেছেন। অনেকে আবার বলছেন, বিশ্বায়ন নির্ভর কর্মসংস্থানের অস্থিরতা না কাটালে আমাদের আইটি খাতের যাত্রা ‘তৈলাক্ত বাঁশে বানরের উড্ডোয়নের মতো’ই হবে।নিজ নিজ ফেসবুক টাইমলাইনে স্ট্যাটাস দেয়া ছাড়াও প্রিয়.কম’র ফেসবুক পেইজ ও ওয়েবসাইটে অনেকেই মন্তব্য করেছেন একসেঞ্চার নিয়ে। সেসব স্ট্যাটাস ও কমেন্ট থেকেই কিছু চুম্বক অংশ নিয়ে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

একসেঞ্চার নিয়ে প্রিয়.কমে প্রথম রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর জিয়া হাসান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, প্রিয়.কমের রিপোর্ট দেখতে পেলাম একসেঞ্চার বাংলাদেশে কর্মরত ৫৫৬ জন কর্মীকে আজকে ১৮ জুলাই এক সাথে ছাঁটাই নোটিশ পাঠিয়েছে এবং এই ছাঁটাইয়ের সাথে সাথে সব দেনা শোধ করে কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এতো বড় একটা নিউজ কোন নিউজ পেপারে পেলাম না। এক্সেঞ্চার বিশ্বের সব চেয়ে বড় আইটি আউটসোর্সিং কোম্পানি গুলোর মধ্যে একটা। ফরচুন ১০০ এর ৯৫টা কোম্পানি তাদের ক্লায়েন্ট। তাদের টোটাল রেভিনিউ আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরের এক বছরের আয়ের সমান।

তিনি লিখেন, সরকার যে এখন বিপিও নিয়ে কোটি কোটি টাকার সেমিনার করছে, সেই আইটি বান্ধব সরকারের বক্তব্য কি? ৬০০ জনের কোম্পানি ৬ হাজার জনে পরিণত না হয়ে কেন ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাচ্ছে? যে কোম্পানি ভারতে ১.৩ লক্ষ কর্মী নিয়োগ দেয়, সেই কোম্পানি কেন বাংলাদেশে মাত্র ৬০০ এমপ্লয়ির ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবেনা? একসেঞ্চারের মতো কোম্পানি যদি বাংলাদেশে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যায়, বাকিরা কীভাবে আসবে?

জিয়া হাসানের ফেসবুক স্ট্যাটাস

প্রিয়.কম’র প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি লিখেন যে, দেখতে পাচ্ছি, নেগোসিয়াসনে জনশক্তি মন্ত্রী পর্যন্ত এঙ্গেজ ছিল। মন্ত্রী লেভেলে এঙ্গেজমেন্ট হওয়ার পরেও কেন একসেঞ্চার চলে যাচ্ছে?  বাংলাদেশ আইটি সেক্টরে, বা বিপিও সেক্টরে লক্ষ লক্ষ লোক নিয়োগ করবে আগামী ২০ বছর পরে, এই স্বপ্ন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার প্রজেক্ট তৈরি করা হয়েছে, সেই স্বপ্ন তাহলে কতটুকু সত্য কত প্রতারণা? বিপিওর নামে বিশাল বিশাল সেমিনার করা হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগেই। কিন্ত ৬০০ লোক ৬ হাজার না হয়ে, একসেঞ্চারের মত সারা বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি মাত্র তিন বছরে ব্যবসা গুটিয়ে চলা যাচ্ছে। এতগুলো হাই স্কিল কর্মচারীর কি হবে? তাদেরকে কে নিয়োগ করবে? একসেঞ্চার চলে গেলে আর কোন ভালো কোম্পানি বাংলাদেশে বিপিও নিয়ে আসবে না। অথচ বাংলাদেশ বিপিও করে কত কত বিলিয়ন ডলার আয় করবে আগামী দশকে এই সব গল্প ফাঁদা হয়েছে। এই সব গল্প জাস্ট প্রজেক্ট বানিয়ে পয়সা খাওয়া ধান্দা বাদে আর কী হতে পারে?

তিনি আরও লিখেন, বাংলাদেশে আইটি সেক্টরের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনার যে বাবল তৈরি করেছে, তাতে কত তরুণ আশাহত হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে এই খবর কে রাখে? এটা কি আর একটা শেয়ার মার্কেটের বাবল বাস্টের মতই হবে?  এই সব প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?

রিফাতুল ইসলাম নাজমুল লিখেছেন, একসেঞ্চার যাচ্ছে, শেভরন যাচ্ছে। সামনে কে যায় দেখার অপেক্ষা। ভরসা রাখলাম।

এহসান কবীর মন্তব্য করেছেন, হুয়াওয়েও বাংলাদেশে গনহারে ছাঁটাই করছে। একদিনের নোটিশেও অনেককে চলে যেতে হচ্ছে। এদের ১২০০’র মতো কর্মী ছিল। এখন শুনছি ৪০০ এর মত রাখবে। অথচ সরকারের আইসিটির বড় প্রজেক্ট ইনফো-সরকার ফেজ-২, ফেজ-৩, টেলিটক থ্রি জি, ফোর জি কাজ এরাই করছে এবং করবে। প্রতিবছর এদের রেভিনিউ বাড়ছে। কথা হচ্ছে এই ব্যাপারে চাইনিজরা যে ধুরান্দরিটা করে তা হচ্ছে কন্ট্রাকচুয়াল জব রিনুয়াল ইয়ারলি। অথচ বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট একটা সময় পরে এমপ্লয়িদের স্থায়ী করতে হয়। অনেক এমপ্লয়ী কোটকাচারি করেছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কারন সরকারের নিয়ম কেউই মেনে চলে না সরকারের দুর্বলতার সুযোগে।

একসেঞ্চার বন্ধ হয়ে যাবে এটা অনেক বড় ক্ষতি মন্তব্য করে হাসিবুল হাসান লিখেছেন, ৬০০ লোক ছাঁটাই হবে এটা অনেক ক্ষতি এবং একই সাথে চাপের বিষয়। আমাদের দেশে বড় আইটি কোম্পানির চাইতে সাইবার ক্যাফের মত গড়ে ওঠা কোম্পানির সংখ্যাই মনে হয় বেশি। এসব কোম্পানি কত কর্মীকেকে বিনা নোটিশে ছাঁটাই করে আবার কত জন যে মাসের পর মাস বেতন পায় না, আবার কত জন যে পাওনা বেতন না নিয়েই চাকরি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় সে খবরও কেউ রাখে না। শুধু ফ্রিল্যান্সার বানানোর প্রকল্পের খবর আসে।

comment-1-653427328.jpg (548×178)

এম জাকির হোসাইন খান মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের আইটি সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন গল্প ফাঁদা না হলে কন্সাল্টেন্সির নামে বছরে কোটি কোটি টাকা উপার্জনের পথ তো বন্ধ হয়ে যাবে!

হাজ্জাজ বিন ইব্রাহিম লিখেছেন, এই ইউনিয়নের জন্যেই এতগুলো কর্মীর জব এতদিন ছিল, ইউনিয়ন না থাকলে আরও আগেই তাদের চাকরি চলে যেত।

বশির আহমেদ মন্তব্য করেন, কর্পোরেট সকল সুবিধা ভারতীয় কোম্পানীর জন্য, বাকী বিশ্ব দুধ ভাত।

 

বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় মহিবুল মুক্তাদির তানিম লিখেছেন, আইটি সংশ্লিষ্টরা জানে একসেঞ্চারের ছাঁটাই হওয়া ৫৫৬ জনের মধ্যে দেশের সেরা প্রোগ্রামার, সিস্টেম বা নেটওয়ার্ক এডমিনিস্ট্রেটর, প্রজেক্ট ম্যানেজাররা আছেন। কিছুদিন আগে আরেক জায়ান্ট কোম্পানি এরিকসন শতাধিক বাংলাদেশীকে চাকরিচ্যুত করেছে। গত কয়েকবছরে একই কাজ করেছে স্যামসাং, হুয়াওয়ে সহ আরও বহুজাতিক কোম্পানি।

তানিম লিখেন, চাকুরিচ্যুতরা হয়ত আরওে ভাল চাকুরী অর্জন করবেন কিংবা উপার্জিত অর্থ নন-আইটি খাতে বিনিয়োগ করবেন নতুবা দেশান্তরিত হবেন। কিন্তু এই প্রবণতা দেশের আইটি খাতের শ্রমবাজারে যে অস্থিরতা বা অনাস্থার সৃষ্টি করবে তা থেকে উত্তরণের পথ কে দেখাবে? পথ দেখানো কান্ডারিরা গেয়েই যাবেন ‘বিলিয়ন ডলার সম্ভাবনা আইটি খাতে’, ‘আইটি পার্ক হচ্ছে সারাদেশে’, ‘ব্যান্ডউইথের মহাসড়কে দেশ’ ইত্যাদি ইত্যাদি…। অপরদিকে, আমরা শ্রবণ করি ‘২০ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হবে ফ্রিল্যান্সিং বা বিপিও খাতে’, ‘বাংলাদেশ পোস্ট অফিস অ্যামাজন বা আলিবাবার পণ্য পৌঁছে সারাদেশে পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করবে’, ‘আইটি পণ্য জিডিপি বাড়াবে হুড়মুড় করে’… আরও কত কী?

তানিমের ফেসবুক স্ট্যাটাস

তিনি লিখেন, বাস্তবতা হচ্ছে, ফরচুন ৫০০ কোম্পানির একটিরও ম্যানেজমেন্ট কিংবা প্রযুক্তি কার্যালয় বাংলাদেশে নেই, ফ্রিল্যান্সিং মুখে নিয়ে ফেনা তোলে অথচ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যাল এদেশে আশার আলো দেখে না। অথচ, পাশের দেশ ভারতে প্রায় প্রতিটি ফরচুন ৫০০ কোম্পানির কার্যালয় রয়েছে (শুধু একসেঞ্চারেই লাখ খানেক ভারতীয় কর্মরত)। যে প্রক্রিয়া বিশ্বায়ন উপযোগী কর্মসংস্থানকে অনুৎসাহিত করে, সেই প্রক্রিয়া বান্ধব বিনিয়োগ অর্থবহ হচ্ছে কিনা চিন্তার অবকাশ আছে। কান্ডারিরা বুকে হাত দিয়ে কি বলতে পারবেন গত চার পাঁচ বছরে আইটি বা টেলিকম খাতে নতুন কোন গ্লোবাল কোম্পানি কি এদেশে বিনিয়োগ করেছে?

তানিম তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে আরও লিখেন, বিশ্বায়ন নির্ভর কর্মসংস্থানের অস্থিরতা না কাটালে আমাদের আইটি খাতের যাত্রা তৈলাক্ত বাঁশে বানরের উড্ডোয়নের মতই ঠেকবে।

একসেঞ্চার নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রিয়.কমের ফেসবুক পেজে শেয়ার করা হলে সেখানে তাসলিমা হক নামের এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করে লিখেন, কতগুলো ছেলে-মেয়েদের বেকার করে দিলো। কি হচ্ছে এসব? ভালো লাগে না, আমার মা কস্ট পায় এসব নিউজ দেখে। আল্লাহ সবাইকে ভালো করবেন ইনশাআল্লাহ।

তবে একসেঞ্চারের চলে যাওয়াকে অনেকে ভ্রক্ষেপ করতে চাইছেন না।  প্রিয়.কমের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদের নিচে সৈয়দ তামিম ইসলাম নামে একজন লিখেন, একসেঞ্চার চলে যাওয়াতে আমাদের দেশের প্রযুক্তিবিদরা ওভাররিয়েক্ট করছে। তারা বলছে একসেঞ্চার চলে যাওয়ায় বাংলাদেশের টেক ইন্ড্রাস্টিতে বিনিয়োগকারী আসবে না। কাম অন! একসেঞ্চার বাংলাদেশের আইটি ইন্ড্রাষ্টি চালায় না। একসেঞ্চার টাইগার আইটি, জুমশেপার, ম্যাগনিটো ডিজিটাল, নিউজক্রেড, ডাটা সফট, লিড সফট, রিভ সিস্টেমস, রিলিসোর্স ইত্যাদি কোম্পানীর জন্ম দেয়নি।

তিনি বলেন, একসেঞ্চারের মতো একটি কোম্পানী যদি আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যায়, তাহলে কোন পরিবর্তন হবে না। আরও অনেক আইটি ফার্ম এসে ওদের জায়গায় প্রতিস্থাপিত হবে। সত্যি বলতে ছোট আইটি ফার্মগুলোই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ, বিদেশী বড় কোম্পানীগুলো নয়।

তিনি আরও বলেন, একসেঞ্চার বাংলাদেশকে কিছু মনে করে না। বিশ্বব্যপী তারা তাদের কাজের জন্য প্রসংশিত, তাই তাদের চলে যাওয়া নিয়ে ব্যথিত হওয়া বন্ধ করুন।

‘সমস্যা তো আমাদের’, এমন মন্তব্য করে ইমতিয়াজ উল আলম লিখেছেন, আমাদের অভিজ্ঞ লোকবল ছাঁটাই করছে বিদেশি কোম্পানীগুলো। কারণ তাদের ব্যবসা নেই। ব্যবসা যারা দিবে সেই জনগন আমরাই আবার সবথেকে কম মুল্যে সকল সেবা চাই। একটু টাকা বাড়ালেই কোম্পানীগুলোর গুষ্টি উদ্ধার করি। তো, কোম্পানীর ইনকাম না থাকলে কোম্পানী আমাদের রাখবে কি করে? তারপরেও কোন মাল্টিন্যাশনালের এভাবে শাটডাউন কোনভাবেই কাম্য নয়।

একজন লিখেছেন, সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান করতে না পারলে (সম্প্রীতি অনেক কোম্পানি চলে গেছে) সামনের দিনগুলিতে হাহাকার আরও বাড়বে। শুধু ওয়েবসাইট কোম্পানি ,ই-কমার্স কোম্পানি , ফেইসবুক ইউসার বৃদ্ধি, সেমিনার মানে ডিজিটাল বাংলাদেশ না , ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে কোর টেকনোলজি কোম্পানি করতে হবে তাতে সরকারের সহজোগিতা করতে হবে , তারপর আস্তে আস্তে ডিজিটাল বাংলাদেশ আশা করা যায়।

প্রিয় টেক/মিজান